খোলাফা-ই রাশেদীন ও সর্বোত্তম নির্বাচন  জননেতা মাওলানা এম এ মান্নান

0
761
খোলাফা-ই রাশেদীন ও সর্বোত্তম নির্বাচন  জননেতা মাওলানা এম এ মান্নান
খোলাফা-ই রাশেদীন ও সর্বোত্তম নির্বাচন  জননেতা মাওলানা এম এ মান্নান

খোলাফা-ই রাশেদীন ও সর্বোত্তম নির্বাচন

 জননেতা মাওলানা এম এ মান্নান

‘খলীফা, রাষ্ট্রনায়ক ও নেতা নির্বাচন কিংবা মনোনয়ন বিশ্ব-রাজনীতির ইতিহাসে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ নির্বাচন কিংবা মনোনয়ন সঠিক হলে একটি জাতি ও দেশ উন্নতি ও সুনামের চরম শিখরে পৌঁছতে পারা অনিবার্য, আর এ ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় ঘটলে সংশ্লিষ্ট জাতির জীবনে অকৃতকার্যতা ও দুর্ভোগ নিশ্চিত।

আমাদের আক্বা ও মাওলা বিশ্বনবী বিশ্বে শুধু রসূল, নবী ও মনীষী হিসেবে সর্বশ্রেষ্ঠ, তা নয়; বরং তিনি সর্বকালের, সর্বযুগের, সর্বশ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ এবং রাষ্ট্রনায়কও। এ কারণে মাইকেল এইচ হার্ট তাঁর ‘দি হান্ড্রেড’ নামক পুস্তকে বিশ্বের ১০০ শ্রেষ্ঠ মণীষীর মধ্যে ‘সর্বপ্রথম’ হিসেবে আমাদের নবীর জীবনীকেই স্থান দিয়েছেন। এ’তে লেখক বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনী লিখতে গিয়ে খ্রিস্টান লেখক ঐতিহাসিক উইলিয়াম ম্যুরের ঐতিহাসিক মন্তব্য উদ্ধৃত করেছেন- – He was the mater mind not only of his age but of all ages. অর্থাৎ ‘‘হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) যে যুগে প্রথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন তাঁকে শুধু ওই যুগেরই একজন মনীষী বলা হবে না; বরং তিনি ছিলেন সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মনীষী।’’
এ পুস্তকে আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘‘শুধুমাত্র ঐতিহাসিক উইলিয়াম ম্যুরই নন, পৃথিবীর বুকে যত মনীষীর আবির্ভাব ঘটেছে, প্রায় প্রত্যেকেই বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে তাঁদের মূল্যবান বাণী পৃথিবীর বুকে রেখে গেছেন। পবিত্র ক্বোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রসূল (হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম)-এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। [সূরা আহযাব:, আয়াত-১১]
এ’তে আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘বর্তমান অশান্ত, বিশৃঙ্খল ও দ্বন্দ্বমুখর আধুনিক বিশ্বে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে অনুসরণ করা হলে বিশ্বে শান্তি ও একটি অপরাধমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
[সূত্র. ‘দি.হান্ড্রেড’, কৃত- মাইকেল এইচ.হার্ট]
সুতরাং বিশ্বনবীর বিশ্বশ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় খলীফা, রাষ্ট্রনায়ক ও নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সর্বোত্তম ও সর্বাধিক কল্যাণকর দিকনির্দেশনা প্রস্ফুটিত হয়েছে। এ দিক-নির্দেশনার আলোকে বিশ্বনবীর খোলাফা-ই রাশেদীন নির্বাচিত হয়ে বিশ্বের ইতিহাসে অত্যন্ত প্রশংসিত ও অনুকরণীয় হয়ে আছেন। বিশ্বনবীর মহান আদর্শে রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা, সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশ ও জাতির শান্তি ও সমৃদ্ধি কায়েম করা; ওই শাসন ব্যবস্থা দেশে যেভাবেই কায়েম হোক না কেন। এ কারণে তিনি ইসলামের প্রথম চার খলীফার সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে যেমন ইঙ্গিতপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন, তেমনি তাঁদের পর হযরত আমীর মু‘আভিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে নূরানী নসীহত করেছিলেন, ‘তুমি বাদশাহ্ হলে ইনসাফ (আদল) বা ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করবে।’ সুতরাং খোলাফা-ই রাশেদীন থেকে আরম্ভ করে যাঁরা দেশ পরিচালনা ও জাতির নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হয়ে প্রশংসা কুঁড়িয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকের মধ্যে ‘ন্যায়পরায়ণতা’ অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিদ্যমান।
ক্বোরআন-ই করীমে এরশাদ হয়েছে, ‘‘ইন্না আকরামাকুম ‘ইনদাল্লা-হি আতক্বা-কুম’’। (নিশ্চয় আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে অধিকতর মর্যাদাপূর্ণ হচ্ছেন তিনিই, যাঁর মধ্যে তাক্বওয়া বা খোদাভীতি তোমাদের সবার চেয়ে বেশি আছে।) [সূরা হুজুরাত: আয়াত-১৩] সহীহ্ হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, ‘আল-আইম্মাতু মিন ক্বোরাইশ’ (ইমাম হবেন ক্বোরাঈশ বংশ থেকে) সুতরাং বিশ্বনবীর ওফাত শরীফের পর এসব দিক-নির্দেশনা ও মৌলিক নীতিমালার উপর ভিত্তি করে খোলাফা-ই রাশেদীনের (ইসলামের প্রথম খলীফাগণ) নির্বাচিত হয়েছেন। এখন দেখুন এ আদর্শ ও অনুকরণীয় খলীফাগণের কে কিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন!

হযরত আবূ বকর সিদ্দীক্বের নির্বাচন
হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ওফাত শরীফের পর তখনও হুযূর-ই আক্রামের দাফন শরীফ সম্পন্ন হয়নি, ওদিকে তাঁর উত্তরাাধিকারী হিসেবে কে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান হবেন, তা নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি সাহাবা-ই কেরামের সামনে আসলো। কারণ, ইসলামী রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব, গৌরব, শান্তি ও সমৃদ্ধি অক্ষুন্ন থাকা ইত্যাদি এ সিদ্ধান্তের উপরই নির্ভরশীল ছিলো; অন্যথায় হুযূর-ই আক্রামের নূরানী হাতে যেই ইসলাম পূর্ণতা লাভ করেছে, আর যেই ইসলামী রাষ্ট্র এবং এ মুসলিম জাতি বিশ্ব-ইতিহাসে যে প্রশংসা কুঁড়িয়েছে তা নিঃশেষ কিংবা অপূরণীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবার আশঙ্কা প্রকটভাবে দেখা দিয়েছিলো। সুতরাং মদীনা মুনাওয়ারার সক্বীফা-ই বনী সা-ইদা’য় প্রথমে আনসারী সাহাবীগণ সমবেত হয়ে এ ব্যাপারে আলোচনা আরম্ভ করেন। এখানে আনসারীদের বিভিন্ন অবদানের বিষয় আলোচনায় আসে এবং খলীফা নিয়োগের ক্ষেত্রে এ অবদানগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে আনসারীদের থেকে খলীফা নিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। অন্যদিকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম গোত্র ক্বোরাঈশের মুহাজির সাহাবা-ই কেরামের উপস্থিতি এবং তাঁদের অধিকতর যোগ্যতা ও আরবের সকল গোত্রের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ও আলোচনায় কম গুরুত্ব পায়নি। ইসলামী রাজনীতির এমন অতি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছিলো অতীব তাৎপর্যবহ।
সুতরাং সৌভাগ্যক্রমে, ইত্যবসরে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক্ব হযরত ওমর ফারূক্ব ও হযরত আবূ ওবায়দাহ্ ইবনুল জাররাহ্ (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুম)কে সাথে নিয়ে সেখানে (স্বক্বীফাহ্-ই বনী সা‘ইদাহ্) পৌঁছে যান। সেখানে হযরত আবূ বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু অতি ন¤্রভাবে একটি দলীল- প্রমাণ ও যুক্তিভিত্তিক বক্তব্য প্রদান করেন এবং বুঝিয়ে বললেন, ‘‘আমরা আনসারের ঐতিহাসিক অবদানগুলো কায়মনোবাক্যে স্বীকার করি; কিন্তু আরবের পাশ্ববর্তী বদভী গোত্রগুলোতো ক্বোরাঈশ ব্যতীত অন্য কারো নেতৃত্ব মেনে নেবে না। তদুপরি, মদীনা মুনাওয়ারার আউস ও খাযরাজ ইত্যাদি গোত্রগুলোও পরস্পর পরস্পরের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য না করার আশঙ্কা রয়েছে। সুতরাং উত্তম হবে মুহাজিরদের থেকে আমীর (খলীফা) নিয়োগ করা।’’ এ যুগান্তকারী প্রস্তাব ও ফলপ্রসূ পরামর্শের বিপক্ষে যাতে কোন আনসারী না যান, তজ্জন্য হযরত আবূ ওবায়দাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু তাঁর বক্তব্যে আনসারী সাহাবীদের উদ্দেশে বললেন, ‘‘তোমরাই সর্বপ্রথম ইসলামের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছো, সুতরাং ইসলাম ও ইসলামী রাষ্ট্রের, খোদা না করুন, পতন বা ধ্বংসের ক্ষেত্রেও যেন তোমরা সর্বপ্রথম ভূমিকা পালন না করো।’’ তাঁর এ বক্তব্য সবার মধ্যে দারুন প্রভাব ফেললো। তখন হযরত বশীর ইবনে সা’দ আনসারী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু দাঁড়িয়ে বললেন, ‘‘হে আনসারীরা! আমরা এ পর্যন্ত ইসলামের স্বার্থে যা করেছি, সবই শুধু ও শুধু আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য ও আল্লাহ্ এবং তাঁর রসূলের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই করেছি। আমাদের সেগুলোর প্রতিদান দুনিয়ায় চেয়ে নেয়া সমীচিন হবেনা। আমাদেরকে এর প্রতিদান আল্লাহ্ তা‘আলাই দেবেন। খিলাফতের উপযুক্ত তোমাদের চেয়ে হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর গোত্রীয়রাই অধিক। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং বিরোধিতা (দলাদলি) থেকে বিরত হও।’’ এ বক্তব্য শুনে আনসারীগণ সর্বান্ত:করণে তা মেনে নিলেন।
এরপর হযরত আবূ বকর সিদ্দীক্ব বললেন, ‘‘এখানে হযরত ওমর ও হযরত আবূ বায়দাহ্ (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুম) উপস্থিত আছেন। তাঁদের থেকে যাকে পছন্দ করো তাঁকে খলীফা নিয়োগ করে নাও এবং তাঁর হাতে বায়‘আত করে নাও।’’ তখন হযরত ওমর ও হযরত আবূ ওবায়দাহ্ একবাক্যে বলে উঠলেন, ‘‘আপনি মুহাজিরদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উত্তম ও সর্বাধিক সম্মানিত। আর রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সর্বাধিক নৈকট্যধন্য। এমন কে আছে, যে আপনার আগে বাড়তে পারে?’’ একথা বলেই তাঁরা উভয়ে তাঁর হাতে বায়‘আত করে নিলেন। এ খবর বাইরে প্রচারিত হবার সাথে সাথে সবাই খুশী হলেন। সবাই দৌঁড়ে দৌঁড়ে এসে তাঁর হাতে বায়‘আত করতে লাগলেন। মোটকথা, এ নির্বাচন আরবের তদানীন্তনকালীন গণতান্ত্রিক নিয়মে’ সম্পন্ন হয়েছে। অর্থাৎ জ্ঞানী, দূরদর্শী ও যোগ্য লোকেরা সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তিকে এভাবে খলীফা নিয়োগ করেছিলেন।
[সূত্র. তারীখে ইসলাম, ড. হামীদ উদ্দীন]

হযরত ওমর ফারুক্বের নির্বাচন
১৩শ হিজরীর জুমাদাল উখরা মাসে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক্ব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ইমামতের দায়িত্ব পালন করতে লাগলেন। হযরত আবূ বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু যখন নিজের ওফাত (তিরোধান) সন্নিকটে বলে নিশ্চিত হলেন, তখন সম্মানিত সাহাবীদেরকে ডেকে তাঁর পরবর্তী খলীফা নিয়োগের ব্যাপারে পরামর্শ করলেন,। আর নিজ থেকে হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আরা আনহুর নাম প্রস্তাব করে বললেন, ‘‘এজন্য তাঁর চেয়ে বেশী উপযুক্ত ও সমীচিন ব্যক্তি আর কেউ আমার দৃষ্টিগোচর হচ্ছেনা।’’ হযরত আবদুর রহমান ইবনে আঊফ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু আরয করলেন, ‘‘তাঁর যোগ্যতা ও উপযুক্ততা সম্পর্কে কোন সন্দেহ নেই; কিন্তু তাঁকে এ পর্যন্ত কিছুটা কঠোর হিসেবে দেখা গেছে।’’ হযরত তালহা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুও এ মন্তব্য সমর্থন করলেন। এটা শুনে হযরত সিদ্দীক্বে আকবর বললেন, ‘‘তিনি কঠোর এ জন্য দিলেন যে, তিনি আমাকে একটু ন¤্র স্বভাবের দেখতেন। খিলাফতের দায়িত্ব তাঁর উপর আসলে তিনি খোদ্ বখোদ্ (স্বয়ং) ন¤্র হয়ে যাবেন।’’ হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর মতামত চাওয়া হলে তিনি বললেন, ‘‘তাঁর (হযরত ওমর) মনের অবস্থা তার বাহ্যিক অবস্থা অপেক্ষা অনেকগুণ বেশী ভালো।’’ ইত্যবসরে, উপস্থিত সাহাবীদেরকে একজন বললেন, ‘‘হে খলীফাতুর রসূল! আপনি জেনে বুঝে হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর মতে একজন কঠোর ব্যক্তিকে আমাদের খলীফা নিয়োগ করে গেলে কাল ক্বিয়ামতে যদি আল্লাহ্ আপনাকে এ সম্পর্কে প্রশ্ন করেন, তখন আপনি কি জবাব দেবেন?’’ তার জবাবে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক্ব বললেন, তখন আমি আরয করবে, ‘‘হে আল্লাহ্! আমি তোমার বান্দাদের থেকে এমন এক ব্যক্তিকে নির্বাচিত করেছিলাম, যিনি এ পদের জন্য সবার চেয়ে বেশী উপযোগী।’’

রুপ দেখা হয়নি……….
এরপর তিনি হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে ডেকে ওসীয়ৎনামা লিখালেন, যাতে তিনি হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে খলীফা নিয়োগ করেছেন। আর হুকুম দিলেন যেন, সবাই ওসীয়ত শোনার জন্য মসজিদ শরীফে সমবেত হন। তাঁর গোলাম মসজিদে গিয়ে সাহাবা-ই কেরামকে ওসীয়তনামা পড়ে শুনালেন, আর হযরত আবূ বকর সিদ্দীক্ব নিজের শারীরিক দুর্বলতা সত্ত্বেও আপন স্ত্রীর সহযোগিতা নিয়ে প্রাসাদের ছাদের উপর উঠলেন আর উপস্থিত সাহাবীদের উদ্দেশে বললেন, ‘‘আমি আমার কোন আত্মীয় কিংবা আপনজনকে খলীফা বানাচ্ছিনা বরং হযরত ওমর (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু)কে আমার স্থলাভিষিক্ত করেছি, যিনি আমার জানা মতে সর্বাধিক উত্তম ব্যক্তি। তোমরা কি আমার এ নিয়োগের উপর সন্তুষ্ট আছো?’’ সকল সাহাবী রিদ্ওয়ানুল্লাহি আনহুম আজমা‘ঈন সমস্বরে জবাব দিলেন, ‘‘আমরা আপনার এ নির্বাচনের প্রশংসা করছি এবং নিশ্চিতভাবে তা মেনে নিচ্ছি।’’ সুতরাং সকল সাহাবী হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর হাতে বায়‘আত গ্রহণ করে নিয়েছেন।

হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর নির্বাচন
যখন হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর আহত অবস্থা থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার কোন আশা বাকী থাকেনি, তখন শীর্ষস্থানীয় সাহাবীগণ হাযির হয়ে বললেন যেন তিনি কোন উত্তরসূরীকে স্থলাভিষিক্ত করে যান। হযরত ওমর ফারূক্ব খুব চিন্তা-ভাবনা করে শীর্ষস্থানীয় ছয়জন সাহাবীর একটি কমিটি করে দিলেন। তাঁরা হলেন, ১. হযরত ওসমান, ২. হযরত আলী, ৩. হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ, ৪. হযরত তালহা, ৫. হযরত যোবায়র ও হযরত সা’দ ইবনে আবূ ওয়াক্বক্বাস। রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুম। আর তিনি বললেন, এসব বুযুর্গ হলেন বর্তমানে এ উম্মতের মধ্যে সবার চেয়ে উত্তম। তাঁদের থেকে কাউকে খলীফা (আমীর) নির্বাচিত করে নাও।’’
নির্বাচনের পদ্ধতি সম্পর্কে হযরত ওমর ফারূক্ব হুকুম দিলেন, ফয়সালা কমিটির অধিকাংশের রায় অনুসারে হবে। আর যদি উভয় দিকে রায় দাতার সংখ্যা সমান হয়, তবে আমার পুত্র আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর-এর রায় নিয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হব। যদি তার রায় মনপূত: না হয় তবে, ওই দিককে প্রাধান্য দেবে, যে দিকে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থাকবেন। আর তিনদিনের মধ্যে আমার স্থলাভিষিক্ত খলীফা নিয়োগ করে নিতে হবে। আর সিদ্ধান্ত হবার পর যে বা যারা সেটার বিরোধিতা করে তাকে তাদেরকে মৃত্যুদন্ড দিয়ে দেওয়া হবে।’’
সুতরাং হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর ওফাতের পর তার নির্দেশ অনুসারে মাত্র তিনদিনের মধ্যে পরবর্তী খলীফা নিয়োজিত হয়ে যান। আলোচনার অনেক সোপান অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু নির্বাচিত হন।

হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর নির্বাচন
হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুও উপরোক্ত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে খলীফা নির্বাচিত হয়েছেন, কারণ তিনি নিজ থেকে নয়; বরং সাহাবা-ই কেরামের লাগাতার অনুরোধের কারণে বাধ্য হয়ে এ গুরু দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন। তাছাড়া হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর ওফাতের পর হযরত আবদুর রহমান ইবনে রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু পূর্বোল্লেখিত ছয়জন সাহাবীর সমন্বয়ে গঠিত কমিটিতে হযরত ওসমান ও হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমাকে খিলাফতের উপযোগী সাব্যস্ত করেছিলেন। সুতরাং হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু খলীফা পদে অধিষ্ঠিত রয়ে শাহাদত বরণের পর অনায়াসে খিলাফতের দায়িত্বভার হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর উপর ন্যস্ত হয়। [সূত্র. তারীখে ইসলাম: কৃত. ড. হামীদুদ্দীন]

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর শাহাদতের পর হযরত হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু খলীফা হন। হযরত হাসানের খিলাফতের পক্ষেও সর্বসম্মত ঐকমত্য পাওয়া গিয়েছিলো। কারণ, তাঁর যোগ্যতার ভিত্তিতে সুন্নীগণ (সিরিয়া ব্যতীত) গোটা ইসলামী রাষ্ট্রের জনগণ একচ্ছত্রভাবে তাকে সমর্থন দিয়েছিলেন, আর শিয়া-রাফেযীগণও তাঁকে এজন্য সমর্থন দিয়েছিলো যে, তিনি আহলে বায়তের সম্মানিত সদস্য, হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর জ্যোষ্ঠ সাহেযাদা। তিনি মাত্র ছয়মাস খিলাফতের দাযিত্ব অসি সুন্দরভাবে পালনের পর মুসলিম উম্মাহকে অনিবার্য রক্তপাত ও বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষার মানসে হযরত আমীর মু‘আভিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর পক্ষে খিলাফতের দায়িত্ব থেকে অব্যাহত নিয়েছিলেন, তারপর সমগ্র মুসলিম রাষ্ট্রের ‘বাদশাহী’ হযরত আমীর মু‘আভিয়ার হাতে ন্যস্ত হয়েছিলো। তিনিও অতি দক্ষতা ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে দীর্ঘদিন ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। অবশ্য তাঁরপর থেকে ইসলামী রাষ্ট্রে দীর্ঘদিন যাবৎ রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এ নিয়মে যাঁরা রাষ্ট্র প্রধান হয়েছেন, তাদের মধ্যেও অনেকে ন্যায়পরায়নতার সাথে রাজ্য পরিচালনা করেছেন। যেমন হযরত ওমর ইবনে আবদুল আযীয রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু। আব্বাসীয় শাসনামলে বাদশাহ্ হারূন রশীদ, এদিকে আরো পরে, কাবুলে সুলতান মাহমূদ গযনভী, তাঁর পরে ভারত উপমহাদেশে মুঘল স¤্রাট ইলতুৎমিশ, বাদশাহ্ আওরাঙ্গজেব (আলমগীর) প্রমুখ। এ শেষোক্তগণ রাজতান্ত্রিক নিয়মে রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত বা নিযুক্ত হলেও তাঁদের ন্যায়পরায়ণতা ও সুশাসনে জনগণ তাদের অধিকার ও মর্যাদা পেয়েছে, তাই তাদের শাসনকার্যেও ইসলামের শিক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে এবং ইসলাম ও মুসলমানদের গৌরব বৃদ্ধি পেয়েছে।
আরো লক্ষ্যণীয় যে, ক্রমান্বয়ে বিশ্বে রাজতন্ত্রের চেয়ে আধুনিক গণতন্ত্র, রাজনীতির ক্ষেত্রে বেশী অনুসৃত হয়েছে ও হচ্ছে। এর সাথে সাথে বিশ্ববাসী বিশ্বনবীর শিক্ষা ও দীক্ষা এবং দিকনির্দেশনা প্রতিষ্ঠিত ও অনুসৃত খোলাফা-ই রাশেদীনের গণতান্ত্রিক নিয়ম-পদ্ধতি, এর পরবর্তীতে অনুসৃত রাজতন্ত্র এবং আধুনিক গণতন্ত্রের স্বরূপ ও কার্যকারিতা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছে। আর বর্তমানে তুলমানমূলক বিবেচনায় বিশ্বনবীর নির্দেশিত ও খোলাফা-ই রাশেদীনের অনুসৃত শাসন ব্যবস্থাই সর্বাধিক ফলপ্রসূ ও উপকারী বলে প্রমাণিত হয়েছে। কারণ, তাঁদের খলীফা তথা রাষ্ট্রনায়ক ও নেতা নির্বাচনের পদ্ধতি ছিলো সর্বাপেক্ষা উত্তম ও সঠিক। সেটার মাধ্যমে দেশ ও জাতি পেয়েছে সৎ, খোদাভীরু ও যোগ্য শাসক ও নেতৃবর্গ। কারণ, তাঁরা নির্বাচিত হয়েছেন সমসাময়িক সর্বাপেক্ষা যোগ্য, সৎ, খোদাভীরু, শিক্ষিত, নিষ্ঠাবান লোকদের মাধ্যমে। পক্ষান্তরে, আধুনিক গণতন্ত্রের সুবাদে কৌশলে, গায়ের জোরে ও বিপুল অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে কোথাও কোথাও অযোগ্য, অসৎ, স্বার্থপর, অদূরদর্শী, অশিক্ষিত ও অযোগ্য লোকেরাও রাজনৈতিক নেতৃত্বে আসার সুযোগ পায়। এজন্য আধুনিক গণতন্ত্রের সুফল ও কুফল নির্ণয় করতে গিয়ে কোন কোন নাম করা রাষ্ট্র বিজ্ঞানী এটাকে গণতন্ত্র নয়; বরং ‘মূর্খতন্ত্র’ বলেও সাব্যস্ত করেছেন।
পরিশেষে, আমরা তো মুসলমান বরং সুন্নী মুসলমান। আমরা ইসলামের প্রকৃত আদর্শ, সুন্নী মতাদর্শে বিশ্বাসী। বিশ্বনবীর নূরানী ভাষায়, ‘মা-আনা আলায়হি ওয়া আসহাবী’ অর্থাৎ তাঁর ও তাঁর সাহাবীদের আদর্শের অনুসারী। তিনি আমাদেরকে স্পষ্টভাষায় নির্দেশ দিয়েছেন, ‘আলায়কুম বিসুন্নাতী ওয়া সুন্নাতিল খোলাফা-ইর রাশেদীন।’ (তোমাদের উপর আমার সুন্নাত বা পন্থা ও পদ্ধতি এবং খোলাফা-ই রাশেদীনের সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা অপরিহার্য। সুতরাং আমরা আর কতদিন ওই ইহুদী-খ্রিস্টানদের আবিস্কৃত ও অনুসৃত তথাকথিত আধুনিক গণতন্ত্রের পেছনে দৌঁড়াবো?
উল্লেখ্য যে, আমরা যুগের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে আমাদের দল ও সংগঠনে এতদিন আধুনিক গণতন্ত্রের পথ অবলম্বন করে এসেছি। এ’তে দীর্ঘদিন যাবৎ আমরা একেবারে নিষ্ফল হয়েছি, তাও বলবো না; কিন্তু ক্রমশ: এ পদ্ধতিতে, বিশেষত: দল ও সংগঠনের নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে আধুনিক গণতন্ত্রের অনিবার্য কুফলগুলো আমাদের নিষ্কলুষ দল ও সংগঠনের দিকে ধেয়ে আসছে। এ গণতন্ত্রের সুবাদে দলৗ সংগঠনের মধ্যে দলাদলি, আঞ্চলিকতা, স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতিত্ব, হঠকারিতা, স্বার্থপরতা ও নেতৃত্বের লোভ ইত্যাদি দানা বেঁধে উঠতে দেখা যাচ্ছে, যেগুলোর মূলোৎপাঠন ভবিষ্যতে পথরোধ করা ন গেলে আমাদের এ পূত:পবিত্র, নিষ্কলুষ দল ও সংগঠনকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। এত বছরের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতার পর্যবশিত হতে বাধ্য। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হচ্ছে, আমাদেরকে সহসা খোলাফা-ই রাশেদীনের অনুসৃত নির্বাচন পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়া।

আলহামদু লিল্লাহ্! আমাদের সর্বোচ্চ জাতীয় সংগঠন (দল) হিসেবে রয়েছে, ‘বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট’ যার রয়েছে সর্বোচ্চ ফোরাম দলে কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম’। এ প্রেসিডিয়াম’ আমাদের সুন্নী অঙ্গনের অধিকতর যোগ্য, জ্ঞানী, নিষ্ঠাবান ও দূরদর্শী ব্যক্তিবর্গ দ্বারা গঠিত। সুতরাং এ ‘প্রেসিডিয়াম’ এবং এর সাথে দলের কেন্দ্রীয় মহাসচিব সমন্বয়ে দলের কেন্দ্র ও এর শাখাগুলো এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর উচ্চ নেতৃত্বে যোগ্য লোকদের নিয়োগ করলেই সবার জন্য মঙ্গল হবে। অতি সুখের বিষয় যে, বিলম্ব হলেও অতি সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়ামের বৈঠকে, ‘বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট’ এবং এর অঙ্গ সংগঠন ‘বাংলাদেশ ইসলামী যুবসেনা’ এবং সহযোগী সংগঠন ‘বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা’ এবং অবিলম্বে সর্বক্ষেত্রে ‘নির্বাচন’ পদ্ধতি হিসেবে খোলাফা-ই রাশেদীনের ‘নির্বাচন-পদ্ধতি’কেই অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আরো আনন্দের বিষয় যে, এরপর সর্বপ্রথম ‘বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা’র পরবর্তী (আসন্ন) কাউন্সিলে এর নেতৃবর্গ এ পদ্ধতিতেই নিয়োজিত হতে যাচ্ছে। আল্লাহ্ সহায় হোন! আ-মী-ন।

#চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ও
প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here